আন্দামান ভ্রমণ পর্ব-২
. রামধনু ও মেঘবালিকা পর্ব ২
ঝরঝর ধারে বারিবর্ষণ হল এক পসলা। তারপর সূর্য মেঘকে ফাঁকি দিয়ে আড়ালে থেকেও উঁকি মারল। অমনি সুযোগ পেয়েই রামধনু ভেসে উঠল সেই জলভরা মেঘের প্রান্তে। এ মাথা থেকে ও মাথা। তবে তা সব সময় হবে না যখন ওর ইচ্ছা হবে তখনই। বিজ্ঞরা বলবেন, তা কেন? সেরকম পরিবেশ তৈরি হলে তবেই না ওর সময় হবে। সে যাই হোক না কেন, মাটির পৃথিবী থেকে রামধনু দেখা এক, আর যদি ওটি হয় মাটির পৃথিবী থেকে ছাড়িয়ে অন্য কোনও এক জায়গা থেকে, তবে কেমন হবে তা?
নিচে পুঞ্জপুঞ্জ তুলোট মেঘ। এক সারি, দুই সারি, সারি সারি না বলে বরং বলা ভালো এক ধাপ দু'ধাপ তার ওপর আরও ধাপ, স্তরের উপর আরও স্তর। সেই প্যাঁজা তুলোর মতো নরম মেঘের উপর আলো পড়ে কোথাও সেটি সোনারঙের, কোথাও ছায়াছায়া, কেউ পেয়েছে এক ছটাক তো পাশেরটি পেয়েছে পো খানেক। এ এমন সাদা যা বর্ণনা করা সাধ্যাতীত। এর পরেই ধুলোট মেঘ। চলছে তো চলছেই। আমিও মেঘের সাথে চলেছি। মেঘ স্থির, আমি চলমান। তুলোট মেঘের শেষ হয় তো ধুলোট মেঘের শুরু। তারপর কাজল কালো মেঘ।
তারপর …….তারপর দেখা যায় না সে বারিবর্ষণ, বোঝা যায়। ওই মেঘ জলে ভরা। নিচে তা পড়ছে। তার উপরে আকাশ ফাঁকা, কেউই ওকে ছায়া দিচ্ছে না। কিন্তু সে ছায়া না থাকলেও মায়াময় দৃশ্য সৃষ্টি করার ক্ষমতা প্রকৃতির করায়ত্ব। সেই মেঘবালিকার বান্ধবীর উপর রামধনু যার মাটির কাছাকাছি বেগুনি, নীল তারপর…. আসমানী, সবুজ, হলুদ। আমার কাছাকাছি কমলা, লাল। একেবারেই উল্টানো সজ্জা। আমি যে ওই রামধনুর ওপর দিক পানে। যন্ত্রশকটে আকাশ পথে চলমান।
আমার ভ্রমণ শুরু হল।
যাব আন্দামান।
আন্দামানের একেবারে দখিনপানে ভারত মহাসাগর। এতদিন মানস ভ্রমণ করেই এসেছি, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ। প্রকৃতির এই সুন্দর সৃষ্টি, একই সাথে জল, জঙ্গল, পাহাড় অনেক যত্নে তৈরি। একঝলক তা আকাশ পথেই দেখে নিই।
সমুদ্রের উপর দিয়ে আসার আগে সুন্দরবনের উপর দিয়ে যখন চলেছি তখন তা দেখেছি, সত্যিই সুন্দর, একেবারে ছককাটা সুন্দরী।
অজস্র নকশা করা নদী, শাখা নদী, উপশাখা নদী, যেন সবুজ গালিচার উপর দক্ষ অঙ্কন শিল্পীর নিপুন তুলিতে আল্পনায় আঁকা। দাগগুলি যখনই চিকন হয়েছে তখনই মনে হয়েছে, ওই চিকন পথেই মৌলেরা মধু সংগ্রহ করতে নৌকা নোঙর করে, বনবিবির মানত দিয়ে বাদাবনে নেমেছে। আর বাদাবনের রাজা হয়তো ওদের জন্য ওত পেতে বসে আছে। ওরা তো মানবেতর প্রাণী, তবে ও শক্তিশালী ও ভয় পায় না বরং ভয় পায় নিরস্ত্র মানুষ যারা অন্নের সংস্থান করতে, ওই মরণ বিপদেরও ঝুঁকি নিতে বাধ্য হয়।
আর আমি যেখানে চলেছি, সেই আন্দামানের আদি বাসিন্দাদের ভূত ভবিষ্যৎ? কী ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে!
মেঘবালিকার সাথে রামধনুর সাথে সাক্ষাৎকার শেষ হয়। নীল জলরাশির উপর চলতে চলতে হঠাৎ চমকে যাই, এ জায়গাটি এ কেমনতর যেন! না জল না স্থল!
তবে কি কাদার ভূখণ্ড?
অবাক হওয়ার মতোই বিষয়। এ সমুদ্র মধ্যে কোথা থেকে এল, এত কাদা! হতে পারে পলি জমার ফলে এমন মাইলের পর মাইল কাদার সাম্রাজ্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু হিসাব তো মেলে না।
এখানে নদী কই?
নদীর মোহনা কই?
এ তো সমুদ্র! তবে কি সমুদ্র ও পলি বহন ক'রে কোথাও না কোথাও জমা করে? এমন তো জানা নেই। তবে জানা আছে, টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার জন্য কোথাও কোথাও সমুদ্র তলদেশ উঁচু হয়ে যেতে পারে। সে যে কারণেই হোক, ওই ৯০০ কিলোমিটার গতিতে চলমান যন্ত্রসকটের মধ্য থেকে আমার চোখ ৩ কিলোমিটার উপর থেকে যে চৌকোনো, গোল বা বহুভুজাকার ক্ষেত্রগুলো দেখতে পাচ্ছি তা নেহাত দৈর্ঘ্য প্রস্থে কম হবে না। আন্দাজ করতে পারি তার বাহু সকল কয়েক কিলোমিটারের কম হবে না। ওরা যেন হাজার হাজার কচ্ছপের মতো আন্দামানের পাশে বহু বছর ধরে বিশ্রামে আছে। ওরা সব হাজার হাজার বছর ধরে তৈরি হওয়া প্রবাল সাম্রাজ্যের মৃতদেহ। এত! এত বিশাল সাম্রাজ্য! প্রকৃতির খেলা সত্যিই বিস্ময়কর!
যেতে যেতে অবশেষে সে কাদার সাম্রাজ্য অর্থাৎ প্রবাল দ্বীপসমূহ শেষ হয়। এবার আসে সবুজ কিছু দ্বীপভূমি। কিন্তু আবার চমক লাগে। সবুজ দ্বীপগুলির প্রান্তদেশ রুপালি সাদা, তারপর সবুজাভ নীল, তারপরে গাঢ় নীল, অনন্ত নীল জলরাশি। ওই রং নাকি পান্না সবুজ। ওই পান্না সবুজ কেবল নীল জলরাশির জন্য নয়। এ রং নিশ্চিতই বিশেষ কোনও প্লাঙ্কটনের উপস্থিতির কারণে সৃষ্টি। যাই হোক না কেন তা এক দৃষ্টি আকর্ষনের বস্তু এবং নয়ন ও মনোমুগ্ধকরও বটে।
নারিকেল সুপারির জঙ্গলের মধ্যে একটি দুটি করে বসতবাড়ির ছবি ফুটে ওঠে। পর পর এদের প্রাবল্য বাড়ে। এক সময় এক সাথে অনেকগুলো। সবগুলোরই প্রায় একই বৈশিষ্ট্য। উজ্জ্বল নীল রং বাড়িগুলোর ছাদ দুপাশ ঢালু নীল রঙের টিন দিয়ে ছাওয়া অন্য কোনও রঙ বিশেষ দেখতে পাইনি। আমরা পশ্চিমবঙ্গবাসীরা দেওয়াল নীল করেছি, ওরা কিন্তু অনেকদিন ধরেই টিনের রঙ নীল করছে। ওরা করেছে প্রয়োজন বলে, রঙ না করলে মরচে ধরবে। আমরা করছি ভয়ে ও হুজুগে। অনেকে আবার সুবিধা পাওয়ার আশায়।
ভাবনা ভেঙে যায়। নিরাপত্তার কোমর বন্ধনী দিয়ে নিজেকে আসনের সাথে আবদ্ধ করে ফেলি। আকাশপোত এবার পোর্ট ব্লেয়ার বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। প্রস্তুত হই……। অবশেষে কলমও ধরি।
@ রেজানুল করিম
Comments
Post a Comment