আন্দামান ভ্রমন

 
                 আন্দামান ভ্রমণ

              রামধনু ও মেঘ বালিকা

রামধনু না রংধনু ওই বিতর্কে যাওয়ার কোনও প্রয়োজনই মনে করি না। আজন্ম  দেখে এসেছি, জেনে এসেছি, বলে এসেছি যেমন, তেমন রামধনুই থাক। অবাক বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে, আনন্দের আতিশয্যে স্থান-কাল-পাত্র ভুলে ছোটবেলাকার মতো আনন্দে চিৎকার করে উঠেছি, রামধনু এখানে? আমার কাছে এ যে অকল্পনীয়, অজানা বিষয়। কত বিষয়ে কত ঘটনাই তো জানা হয়নি, দেখা হয়নি, এ যাবৎ, তেমনিই এটিও। তাই হোক।


বিতর্কে প্রবেশ না করলেও ওটি তো রংধনুও বটে। বড়দের মুখের কথায় জেনেছি, না খেলার সঙ্গী সাথীদের সাহচর্যে তা এখন মনে করে, বলতে পারব না, তবে ওকে রামধনুই জেনে এসেছি। জেনে এসেছি, বর্ষার আকাশে রামধনু দেখা যায়, তবে তা সব সময় নয়, যখন ওর ওঠার সময় হয়, যখন ওর ইচ্ছা হয় ছোটদের, ছোটদের মনওয়ালা বড়দের খুশি করার, তখনই ও ওঠে।


ধনুকের মতো আকৃতি বলেই ও রামধনু, তবে তা ছিলাহীন। ছিলা নেই বলেই ও বালিহত্যাও করেনি, শম্বুক হত্যাও করেনি। এর বিপরীতে ধনুকের ছিলা ছিল বলেই বিভীষণ তার নিজের ভাই কুম্ভকর্ণকে হত্যা করেছিল। আমাদের এ প্রিয় রামধনু আকারে বৃহৎ। এক আকাশ থেকে আর এক আকাশ অবধি তার সীমানা। সেইজন্যই ও মহানায়ক রামনামধারী ধনুক। রাম মানে আমার কাছে অনেক অনেক বড়। অনেক গুন ব্যপ্ত তার প্রভাব। ভারতীয় জনমানসে তো বটেই এমনকি জনমানস নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রগুলিতেও, যা এখন কম বেশি সবাই বুঝতে পারছেন।


আমার প্রিয় রামধনু, অন্য অনেকের কাছে রংধনু তার মোহিত করার সৌন্দর্যে যুগ যুগ ধরে মানুষকে অবাক করে দিয়েছে। এ নেহাত এক প্রাকৃতিক ঘটনা। যেমন সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ প্রাকৃতিক ঘটনা তেমনই। কিন্তু সেই সব প্রাকৃতিক ঘটনাও কখনও কখনও ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে অপার মহিমান্বিত হয়ে ওঠে। কখনও সখনও ইতিহাসের বাঁক ফেরায়। কোনও জাতির কাছে তা আশীর্বাদস্বরূপ তো অন্য কোনও জাতির পক্ষে তা হন্তারক রূপে হাজির হয়।  এমনই এক ঘটনা ছিল যেদিন এক সাদা মানুষ আমেরিকা মহাদেশের বাহামা দ্বীপভূমিতে পা রাখলেন। সেদিনের সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা, এক সূর্য গ্রহণ, হিস্পানিওয়ালাদের কাছে ঈশ্বর প্রেরিত নতুন এক দেবদূত রূপে তাকে তাদের কাছে উপস্থিত করেছিল। পক্ষান্তরে সেদিনের তাদের সেই ভুল ভাবনা সেই আদিবাসীদের, যারা ছিল আরাওয়াক গোষ্ঠীর, তাদের কাছে পরবর্তীকালে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো এক কালো ঘটনা হিসাবে সেটি উপস্থিত হল। নেহাত এক প্রাকৃতিক ঘটনা সূর্য গ্রহণের সাথে আমি আমেরিকা মহাদেশে পা রাখা প্রথম সভ্য মানুষ হিসেবে খ্যাত একজন হিংস্র, নিষ্ঠুর, মিথ্যুক, আমেরিকা মহাদেশের আদিম জনজাতিকুলের ধ্বংসকারীদের অন্যতম সূচনাকারী মানুষ কলম্বাসের কথা বলছি।


রংধনুর কথায় ফেরা যাক। সেই রংধনু, যার সাত সাতটি রং বেনীআসহকলার মালায় সজ্জিত, ছোট বয়সের অবাক বিস্ময়ে, বড়দের শেখানো বুলিতে শিখে নেওয়া, সবার নিচে বেগুনি তারপর নীল এমনি করেই শেষের আগে কমলা একেবারে শেষে লাল, নিচ থেকে উপর এমনই তার সজ্জা। এই সজ্জা যদি উল্টে যায়, তবে কেমন দেখতে হয়? আশ্চর্য হব না কি?


এবারে আসি মেঘের কথায়। মেঘ যদি না থাকে তবে রামধনু তার স্থান পাবে কোথা? সে ও নেই। সেই জন্যই তো রামধনু ও মেঘের অতখানি বন্ধুত্ব। মেঘের মধ্যেই রামধনু ফুটে ওঠে আবার আস্তে আস্তে সেটি চোখের আড়ালে নিঃশেষ হয়ে যায়। সবই প্রাকৃতিক ঘটনা আবার এর শক্তপোক্ত একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও জানা আছে। নাইবা গেলাম সেই সব ব্যাখ্যায় বরং ওর সৌন্দর্যে মেতে উঠি। মেঘ তো আবার শুধুই মেঘ নয়, এর আবার জ্ঞাতি গোষ্ঠী অনেক। কেউ বা হল ধলো কেউ বা হল কালো, কারো সৌন্দর্যে চোখ ফেরানো যায় না আবার কারো বা ভয়াল ভয়ঙ্কররূপ, করালরূপে হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করে। নীরদ, বারিদ, জলধর বললেই যদি সব রকমের মেঘকে বলা হয়ে যেত তবে তা সহজ সরলভাবেই শেষ হত কিন্তু তা তো হওয়ার জো নেই, এর যে অনেক অনেক রূপ! এর রূপভেদের বর্ণনা দিতে ওই সব তৎসম অর্ধ-তৎসম শব্দের বাহুল্য না বাড়িয়ে বরং এভাবেই বা লিখি না কেন, কেউ হলেন প্রভাতী কেউবা কাজল, একজন হোক ধুলোট তো অন্যজন তুলোট। ভয়ে মরি সিঁদুরে মেঘে, আরও ভয় কাজল কালো মেঘে। আড়িয়া মেঘ, কুড়িয়া মেঘ আরও কত কত মেঘ, তবে সব সেরা মেঘ, ফুলতোলা মেঘ। ও যে এক কিশোরী কন্যা! সেই জন্যই তো আমার কাছে ও হল মেঘ বালিকা।


তবে আমার দেখা এ সৃষ্টি ছাড়া রংধনুর সাথে ওই ফুল তোলা মেঘের মোটেই সখ্যতা নেই। তুলোট মেঘের সাথেও নেই ধূলোট মেঘের সাথেও নেই। সখ্যতা ওর কাজল কালো মেঘের সাথে। ওটিই বারিদ, জলদ, জলধর।


(আমার আন্দামান ভ্রমণের গল্প শুরু হল)



Comments

  1. আজ থেকে ব্লগ লিখতে শুরু করলাম। পাশে থাকবেন, এই কামনা করি।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

আন্দামান ভ্রমণ পর্ব-২